চুনিমণি দাসী ঠাকুরবাড়ি: শতবর্ষ পেরনো কলকাতার সুবর্ণবণিক পরিবারের রথযাত্রার কাহিনী

PCA অ্যাডমিন | জুলাই ১৫, ২০২৬
মধ্য কলকাতার বউবাজার ও তার আশপাশে বেশ কিছু সুবর্ণবণিক পরিবার বসবাস করেন। এই সম্প্রদায়ের অনেকের বাড়িতেই রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। এরকমই একটি সুবর্ণবণিক পরিবার হল চুনিমণি দাসীর দে পরিবার।

গন্নাথদেবের রথযাত্রার কথা উঠলে, নিঃসন্দেহে পুরীর নামটাই প্রথমে মাথায় আসে। প্রাচীনত্বের দিক থেকে ওড়িশার জগন্নাথ ধামের মহিমা বা মাহাত্ম্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরেই শ্রীক্ষেত্র পুরী বাঙালির প্রিয় তীর্থক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। পঞ্চদশ শতকের শেষ থেকে ষোড়শ শতকের শুরুতে শ্রীচৈতন্যদেবের ভক্তি আন্দোলনের প্রভাবে অবিভক্ত বাংলায় জগন্নাথ সংস্কৃতি জনপ্রিয় হয়। চৈতন্যদেবের কারণেই প্রভু জগন্নাথ বাঙালির, বিশেষ করে বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মানুষের, ঘরের ঠাকুর হয়ে ওঠেন। বাংলার বিভিন্ন জায়গায় জগন্নাথ আরাধনা তথা রথযাত্রা বাঙালির এক বিশেষ উৎসবে পরিণত হয়।

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান এই রথযাত্রা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে সাড়ম্বরে পালিত হয়। যেমন হুগলি জেলার মাহেশ, গুপ্তিপাড়া, পূর্ব মেদিনীপুরের মহিষাদলের রথের বিশেষ সুখ্যাতি রয়েছে! কলকাতাতেও বেশ কয়েকটি বনেদি বাড়ি ও ঠাকুরবাড়িতে বংশপরম্পরায় রথযাত্রা পালন করা হয়। মধ্য কলকাতার বউবাজার ও তার আশপাশে বেশ কিছু সুবর্ণবণিক পরিবার বসবাস করেন। এই সম্প্রদায়ের অনেকের বাড়িতেই রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। এরকমই একটি সুবর্ণবণিক পরিবার হল চুনিমণি দাসীর দে পরিবার।

কলকাতার রথযাত্রা

ব্রিটিশদের আসার আগে থেকেই কলকাতায় রথযাত্রা উৎসব পালন করা হত। রথ উপলক্ষে মেলাও বসত। আশেপাশের গ্রাম থেকে আসা মানুষের ভিড়ে জমে উঠত সে সময়ের কলকাতার রথের মেলা। পূর্ণেন্দু পত্রী এই প্রসঙ্গে বলেছেন,

“রথ চলেছে আগে-আগে। পিছনে চারপাশের গ্রাম-গঞ্জের মানুষ। বামুন-পুরোহিত। বাজনা-বাদ্যি। সকলের হাতে রং-চঙে পতাকা। কারো হাতে ঝালর-ঝুলোনো ছাতা। ইয়া বড়-বড় তাল পাতার পাখা। পাখার গায়ে কত কি কারুকার্য। এদিকে মশাল। কোনটা কাপড়ের, কোনটা নারকেলের শাঁসের। আবার রংমশালও জ্বলছে। ওদিকে চলেছে সংকীর্তন। সপ্তাহব্যাপী উৎসব।”

হুতোমের নকশায়, উনিশ শতকের কলকাতা শহরের রথযাত্রার এক বিচিত্র বর্ণনা পাওয়া যায়,

“স্নানযাত্রার আমোদ ফুরুলো, গুরুদাস গুঁই গুল‍্দার উড়ুনী পরিহার করে পুনরায় চির পরিচিত র‍্যাঁদা ও ঘিস‍্কাপ্ ধল্যেন। ক্রমে রথ এসে পড়লো। ফ্যাতো র‍্যতো পরব প্রলয় বুড়ুটে; এতে ইয়ারকির লেশমাত্র নাই, সুতরাং সহরে রথ পার্বণে বড় অ্যাক্‌টা ঘটা নাই; কিন্তু কলিকাতায় কিছুই ফাঁক যাবার নয়; রথের দিন চিৎপুর রোড্‌ লোকারণ্য হয়ে উঠলো, ছোট ছোট ছেলেরা বার্নীস্ করা জুতো ও সেপাইপ্যেড়ে ঢাকাই ধুতি পোরে,কোমরে রুমাল বেঁধে, চুল ফিরিয়ে, চাকর চাকরাণীদের হাত ধরে পয়নালার ওপোর পোদ্দারের দোকানে ও বাজারের বারাণ্ডায় রথ দেখতে দাঁড়িয়েছে। আদ‍্বইসি মাগিরা খাতায় খাতায় কোরা ও কলপ দেওয়া কাপড় পোরে রাস্তা যুড়ে চলেচে; মাটীর জগন্নাথ, কাঁঠাল, তাল‍্পাতের ভেঁপু, পাখা ও শোলার পাখি, বেধড়ক্ বিক্রী হচ্চে; ছ্যেলেদের দ্যাখাদেখী বুড়ো বুড়ো মিন্‌সেরাও তালপাতের ভেঁপু নিয়ে বাজাচ্চেন; রাস্তায় ভোঁ পোঁ ভোঁপোঁ শব্দের তুফান উঠেচে— ক্রমে ঘণ্টা, হরিবোল, খোল, খত্তাল ও লোকের গোলের সঙ্গে একখানা রথ এলো—রথের প্রথমে পেটা ঘড়ি, নিশান, খুন্তি, ভোড়োং ও নেড়ীর কবি; তার পর বৈরাগীদের দু তিন দল নিম খাসা কেত্তন, তার পেছনে সকের সংকীর্ত্তন গাওনা; দোয়ার দলের সঙ্গে বড় বড় আট‍্চালার মত গোলপাতার ছাতা ও পাখা চলেচে, আশে পাশে কর্ম্মকর্তারা পরিশ্রান্ত ও গলদঘর্ম্ম—কেউ নিশান্ ও রেশালার মিলে ব্যতিব্যস্ত, কেউ পাখার বন্দোবস্তে বিব্রত, সখের সংকীর্ত্তনওয়ালারা গোচসই বারাণ্ডার নীচে, চৌমাথার ও চকের সাম‍্নে থ্যেমে থ্যেমে গান করে যাচ্চেন, পেছোনে চোতাদারেরা চেঁচিয়ে হাত নেড়ে গান বলে দিচ্চেন, দোয়ারেরা কি গাচ্চেন, তা তাঁরা ভিন্ন আর কেউ বুজ‍্তে পাচ্চেন না। দর্শকদের ভিড়ের ভিতর এটা মাতাল ছিল, সে রথ দর্শন করে ভক্তিভরে মাত‍্লাম সুরে

কে মা রথ এলি?
সর্ব্বাঙ্গে পেরেক মারা চাকা ঘুব ঘুরালি।
মা তোর সাম‍্নে দুটো ক্যেটো ঘোড়া,
চুড়োর উপর মুক্‌পোড়া,
চাঁদ চামুরে ঘণ্টা নাড়া,
মধ্যে বনমালী।
মা তোর চৌদিকে দেবতা আঁকা,
লোকের টানে চল‍্চে চাকা,
আগে পাছে ছাতা পাকা,
বেহদ্দ ছেনালী।

গানটা গেয়ে “মা রথ। প্রণাম হই মা।” বোলে প্রণাম কল্লে। এদিকে রথ হেল‍্তে দুল‍্তে বেরিয়ে গ্যাল; ক্রমে এই রকমে দু চার খানা রথ দেখতে দেখতে সন্ধ্যা হয়ে পড়‍্লো—গ্যাস জ্বালা মুটেরা মৈ কাঁদে করে দ্যাখা দিলে, পুলিসের পাসের সময় ফুরিয়ে এলো, দর্শকেরাও যে যার ঘরমুখো হলেন।”

রথ উপলক্ষে মানুষের জমায়েত, আনন্দ-অনুষ্ঠান, শোভাযাত্রা, কেনাবেচা – সবই চলত সেই সময় থেকেই। সুতরাং, ব্রিটিশ শাসনের আগেই কলকাতায় রথযাত্রা যে ঘটা করে পালিত হত, তা নিয়ে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই। রথের সময়ের মহাসমারোহের কথা প্রাণকৃষ্ণ দত্তের বর্ণনাতেও পাওয়া যায়,

“রথের উৎসবও কলিকাতায় মহাসমারোহে সম্পন্ন হইত। ইংরাজদিগের আগমনের পূর্ব্বে এখানে যোত্রমান হিন্দু অনেক ছিলেন, তাঁহারা মহাসমারোহে বার মাষের তের পার্ব্বণ সম্পন্ন করিতেন। তাহার প্রমাণ শেঠদিগের লালদীঘির দোল এবং বৈঠকখানার রথে প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে। ঐ রথখানি ইংরাজ ঐতিহাসিকদিগের মতে ৭০ ফুট উচ্চ, সমস্ত বৎসর বৈঠকখানার সুবৃহৎ বট-বৃক্ষের নিম্নে অবস্থিতি করিত, ইহার অধিকারী কাহারা, তাহার কোন প্রমাণ তাঁহারা দেন নাই। আমাদের অনুমান হয়, গোবিন্দপুরের শেঠেরাই ইহার প্রকৃত অধিকারী ছিলেন। লালদীঘি হইতে বৈঠকখানা পর্য্যন্ত সরল পথটীই কলিকাতার অতি পুরাতন ও প্রশস্ত রাস্তা, এই পথেই তাঁহাদের গোবিন্দজীর রথযাত্রা হওয়া সুবিধাজনক।

পোস্তার জগন্নাথের তিনখানি সুবৃহৎ রথ বাহির হইত। এই রথ তিনখানির কথা কলিকাতাবাসী অনেক বৃদ্ধেরই স্মরণ আছে। সম্বৎসর রথ তিনখানি গড়াণহাটায় লালাবাবুর বাটীর প্রাঙ্গণে থাকিত। এই বাটী বর্ত্তমান বিডন উদ্যানের দক্ষিণে চিৎপুর রোডে, সেখানে এখন পাঠের কল আছে। সুবিখ্যাত রাসমণি দাসীর শ্বশুর প্রীতরাম মাড়্ মহাসমারোহে রৌপ্যনির্ম্মিত রথ বাহির করিতেন, সে রথযাত্রা আজিও তাঁহার উত্তরাধিকারীরা করিয়া থাকেন। তদ্ভিন্ন বৈষ্ণব ধর্ম্মাবলম্বী ক্ষমতাবান হিন্দুরা অনেকেই ছোট রথ বাহির করিতেন। এখনও দুই একখানা রথ কলিকাতার পথে দেখিতে পাওয়া যায় বটে, কিন্তু পূর্ব্বের মত জাঁকজমক কিছু নাই বলিলেও বলা যায়। রথযাত্রার অগ্রে নানা বর্ণের দুই শ্রেণী পতাকার মধ্যে বিবিধ প্রকার বাদ্যভাণ্ড, দলে দলে সংকীর্ত্তন, সুবৃহৎ ছাতায় রাস্তা আচ্ছাদিত হইয়া যাইত। ইহার মধ্যে তিন চারি হস্ত পরিধিবিশিষ্ট গোলপাতার ছাতাই অধিক, বস্ত্রের ছাতাও দুই চারিটী থাকিত। এই বস্ত্রের ছাতাগুলি অতি সুন্দর, নানা বর্ণের মোটা মোটা বস্ত্রে আচ্ছাদিত, অতি সুদৃশ্য ঝালোরে তাহার নিম্নদেশ বেষ্টিত, মোটা মোটা বেতের শিক, দুই তিন ইঞ্চি মোটা কাঠের রং করা বাঁট (আজিও কোন কোন নগর সংকীর্ত্তনে গোঁসাইজীর মস্তকে সেই প্রকার ছাতা ধরিতে দেখা যায়)। তা ছাড়া বড় বড় হাতপাখা আড়ানী, রংমশাল, ন্যাকড়ার মশাল এবং নারিকেল শাঁসের মশালের আলোকশ্রেণীতে পথ আলোকিত হইত। কর্ত্তারা খালি গায় খালি পায় কেহ কোমরে কেহ মাথায় উড়ানী বাঁধিয়া বর্ষাকালের কাঁচা রাস্তায় এক হাঁটু কাদার উপর মহা উৎসাহে “জগবন্ধু দেখা দাও আমারে কত মহাপাপী উদ্ধারিলে বসে শ্রীমন্দিরে” প্রভৃতি সংকীর্ত্তন করিয়া নৃত্য় করিতেন। দোলযাত্রার ন্যায় রথযাত্রায় অশ্লীল সঙ্গীত গাইতেন না। পথের উভয় পার্শ্বে তালপাতার ছোট বড় নানাপ্রকার কারুকার্য করা ভেঁপু, মাটীর রথ, জগন্নাথ প্রভৃতি খেলনা, হাঁড়ি ধামা চুবড়ী, নানাপ্রকার ফল, জলপান ও মিষ্টান্ন ইত্যাদির দোকান সাজান হওয়ায় মেলাটী খুব জমকাল হইত। ভীড় এত অধিক হইত যে, কোথাও অধিক জনতা দেখিলে লোকে “রথ দোলের মেলা হইয়াছে” বলিয়া থাকে।”

উনিশ শতকের কলকাতার তিনটি বিখ্যাত রথের প্রসঙ্গ বারবার প্রখ্যাত লেখক-গবেষকদের লেখায় উঠে এসেছে –

১) শেঠদের (মতান্তরে বসাকদের) রথ

যদিও প্রাণকৃষ্ণ দত্ত এই রথকে গোবিন্দপুরের শেঠদের রথ হিসেবে অনুমান করেছেন, তবে মতভেদে অনেকে এই রথকে শোভারাম বসাকের রথ বলে থাকেন। নগেন্দ্রনাথ শেঠ শোভারাম বসাকের জীবন সম্পর্কে লিখেছেন, শোভারাম মুর্শিদাবাদ থেকে সপ্তগ্রামের হলদিপুর হয়ে সপরিবারে গোবিন্দপুরে শেঠদের কাছে বাস করতে থাকেন। তিনি গোবিন্দপুরে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে তিনি পরিবারের সাথে গোবিন্দপুর থেকে সপরিবারে বড়বাজারে এসে বসবাস করতে থাকেন। তাঁর বাড়ির পশ্চিমে গঙ্গার ধারে একটি মন্দির তৈরি করে জগন্নাথ-ত্রয়ীকে প্রতিষ্ঠা করেন। মন্দিরের পাশে জগন্নাথ ঘাট নামে একটি স্নানের ঘাট তৈরি করেন। নগেন্দ্রনাথ শেঠের মতে, ইংরেজ ঐতিহাসিকদের উল্লিখিত রথটি আসলে শোভারাম বসাকের রথ।

২) পোস্তায় জগন্নাথদেবের তিনটি রথ

এই রথ সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না। পোস্তা অঞ্চলের এই তিনটি রথ আকারে খুব বড় ছিল। সারা বছর গরাণহাটায় লালাবাবুর বাড়ির উঠোনে থাকত।

৩) রাণী রাসমণির রথ

জানবাজারের প্রীতরাম মাড়েদের রুপোর রথ ছিল বিখ্যাত। উনি ছিলেন রাণী রাসমণির শ্বশুরমশাই। পরবর্তীকালে এই রথ ‘রাণী রাসমণির রথ’ নামেই পরিচিতি লাভ করে। ১৯৫৩ সালের ১৪ই জুলাই, যুগান্তর পত্রিকায় এই রথ সম্পর্কে লেখা হয়,

“সব রথগুলোর মধ্যে জানবাজারের রাণী রাসমণির রথখানিই বেশী প্রসিদ্ধ। রূপোর রথ – উঁচুতে হাত-আষ্টেক হবে। কিন্তু সে রথ আজ নামেই যেন রূপোর রথ – গায়ে তার রূপোর ভাগ দিন দিন কমছে। রূপোর বদলে এখন এ্যালুমিনিয়ামের রঙকরা টিনের পাতে মুড়ে রথের অঙ্গশোভা যেন বজায় রাখতে হ’চ্ছে। পঞ্চচূড় রথের ওপরের অংশটুকুতেই আজ রূপো আছে – কিন্তু তাতেও যেন রথের পূর্বেকার শ্রী আর ফুটছে না। যদিও সূর্যমুখী পদ্ম আর রজনীগন্ধায় তাকে সাজান হয়। লাল-নীল মখমলের ঝালর, ঘেরাটোপ, আর নিশানেও পূর্বেকার জৌলুস নেই। অবশ্য রূপোর বিরাট ঘোড়াদুটো, সারথি আর পরীকটা রথের গাম্ভীর্য খানিকটা বাড়িয়েছে।

কিছু ব্যান্ড, ব্যাগপাইপ, কাঁসর-ঘণ্টা আর খোল-করতালের সঙ্গে “হরে কৃষ্ণ হরে রাম” গাইতে গাইতে কীর্তনীয়ারা আসছিল রাণী রাসমণির রথের আগে আগে। এক প্রাচীন বৃদ্ধ আঙুল দিয়ে দেখিয়ে খেদের সঙ্গে বলছিলেন, পাশের এক সঙ্গীকে এ রথের গত দিনের ঐশ্বর্যের কথা। বৃদ্ধের কথা কান পেতে আমি শুনি “রথের আগে তখন চল্ত কত বাজনাবাদ্যি, কত গান-কীর্তন। আজ আর তা নেই।” – বৃদ্ধ বলেন আফশোষে। আবার শুনি: “কত রাখাল বালক থাকত।। ছোট ছোট দুটি ছেলে কৃষ্ণ-বলরাম সাজত, অন্য় সব বালক গোপ-বালক সেজে তাদের ঘিরে গান করত। তারা গানে বলতো কি জান? বল্তো, কৃষ্ণ-বলরামকে কিছুতেই মথুরাতে তারা যেতে দেবে না, নিষ্ঠুর উদ্ধব তার রথ ফিরিয়ে নিয়ে চ’লে যাক্, শ্রীমতী আর গোপিনীরা, নন্দ বাবা আর যশোদা মা কৃষ্ণ-বলরামকে হারিয়ে বৃন্দাবনে কেমন ক’রে বে’চে থাকবেন।” বৃদ্ধ আবার বলেন, “আর বাবুদের সেই গান? গিলেকরা পাঞ্জাবী আর চুনোটকরা কালোপেড়ে ধুতি পরা, গলায় উড়ুনী বাঁধা, কানে আতর মাখানো তুলো, গলায় আর হাতে বেলফুলের মালা। সেই সব গাইয়ে বাবুরাও তো আর নেই। আড়ানা রাগে বাবুরা চৌতালে-ঝাঁপাতালে গান ধরতেন- ‘রথে যেও না হে মধুসদন।’ বৃদ্ধের গানটা মনে আছে দেখি – এক লাইন গানও গুন্ গুন্ করে গেয়ে শোনান। আবার শুনি: “পাখোয়াজ বাজ্ত সঙ্গে, কর্ণেট, হার্মোনিয়াম, বেহালা, খঞ্জনী। সে কী গান। গান গাইতে গাইতে বাদুরা গলদ্ঘর্ম হতেন। লাল সালুর ঝালরে মুড়িবাঁধানো নক্সা আঁকা বড় বড় তালপাতার পাখা দুল্ত চাকরদের হাতে। তারা বাতাস ক’রতো রথের আগে আগে এই গাইয়ে বাবুদের মাথার। আর ক দল বাজনা থাক্তো – গড়ের বাদ্যি, ঢাক, ঢোল, কাশী, সানাই। রূপোর আশা-সোঁটা, আড়ানি ঘাড়ে পাইক বরকন্দাজের দল। তারাই বা আজ কোথায় গেল।”

রাণী রাসমণির রথ সামনে দিয়ে চলে গেল – যেন বিগত-যৌবন ভ্রষ্টশ্রী স্থাবর চ’লেছে বৃদ্ধের আফশোষে যেন সে কথা বুঝতে পারি।”

বিশ শতকের কলকাতার আরও একটি বিখ্যাত রথ হল মার্কিন বৈষ্ণবদের রথ অর্থাৎ ইসকনের রথ। ১৯৮০ সালের ১৪ই জুলাই যুগান্তর পত্রিকায় ইসকনের রথ সম্পর্কে লেখা হয়,

“…রথযাত্রার নতুন আকর্ষণ এখন সাহেব কৃষ্ণভক্তদের রথ। ইস্কনের কৃষ্ণভক্তরা গত কয়েক বছর ধরে বিশেষ ধরণের এক রথ কলকাতার রাজপথে টানছেন। এ রথ ফোল্ডিং। প্রয়োজনে এই রথের উচ্চতা কমানো বাড়ানো যায়।

চৌরঙ্গী থেকে বেরিয়ে চিত্তরঞ্জন আভিনিউ ধরে উত্তর কলকাতার শ্যাম পার্কে এসে থাকবে সে রথ সাত দিন। সাত দিনের উৎসবের পর হবে উল্টো রথযাত্রা। রথ ফিরে যাবে তার পুরনো জায়গায়। উচ্চতায় বাহান্ন মিটার। আয়োজন আধুনিক। অতিরিক্ত আকর্ষণ সাহেব কীর্তনীয়ার দল।…”

rath of iskcon calcutta 1979
কলকাতায় ইসকনের রথ ১৯৭৯ [১]

রথযাত্রার সাথে মেলার প্রসঙ্গ উঠে আসা খুবই স্বাভাবিক। পুরনো কলকাতার বিখ্যাত রথযাত্রার সময় বেশ কিছু মেলার সম্পর্কেও জানা যায়। বিশ শতকের একাধিক সালের যুগান্তর পত্রিকায় কলকাতার সবথেকে বড় রথের মেলা হিসেবে বউবাজার-শিয়ালদা এলাকার ন্যাড়া গির্জার* রথের মেলার কথা লেখা হয়েছে। এছাড়াও সেইসময়ে চিড়িয়ামোড়, রাসবিহারীর মোড়, কালীঘাট, ছাতুবাবুর বাজারের মেলার কথাও জানা যায়।

১৯৫৩ সালের ১৪ই জুলাই, যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে সেই সময়ের রথের মেলা সম্পর্কে একটা সামগ্রিক ধারণা তৈরি হয় –

“ক’লকাতার ন্যাড়া গির্জে কলকাতার রথযাত্রা উৎসবে জগন্নাথের যেন মাসীর বাড়ী – ‘গুণ্ডিচা বাড়ী’ অথবা গুজাবাড়ী। এখানে জগন্নাথদেব রথে চ’ড়ে ন্যাড়া গির্জেটা একবার না ঘুরে এলে, তাঁর রথ যেন চ’ল্লই না মনে হবে। অবশ্য পুরী কিংবা মাহেশ প্রভৃতি বড় বড় জগন্নাথক্ষেত্রে আর নামকরা রথযাত্রায় জগন্নাথদেব সোজারথে বেরিয়ে ৭ দিন ‘গুজা বাড়ীতে’ কাটিয়ে আবার উল্টো রথে ফিরে আসেন। ক’লকাতায় কিন্তু সে রেওয়াজ নেই। এখানে রথগুলো বেরিয়ে ক’লকাতার বিভিন্ন রাজপথ পরিক্রমা ক’রে একবার ন্যাড়াগির্জেয় এসে দাঁড়াবে – তারপর আবার সেইদিনই ঘরে ফিরে যাবে। উল্টোরথের দিনেও এ রেওয়াজ। তবে সেদিনটাতে রথ ন্যাড়াগির্জেয় আসে সোজা রথের পথ দিয়ে নয় – অন্য পথে।…

…সোমবার প্রায়, লাখখানেক লোক জমা হ’য়েছে এ মেলায়। বৌবাজার ষ্ট্রীট আর কলেজ ষ্ট্রীটের সংযোগস্থলথেকে সুরু করে একদিকে একেবারে শিয়ালদহ আর অন্যদিকে নারকেলডাঙ্গার মোড় পেরিয়ে সেই ক্যাম্বেল হাসপাতাল পর্যন্ত মেলা ব’সেছিল রাস্তার দু’পাশে।

ক’লকাতায় এখন মেলাটা জমজমাট থাকলেও এক্ষণে আর ‘রথযাত্রা’র জৌলুস তত নেই। সোমবার অবশ্য কিছু কিছু রথ এসে পৌঁছেছিল বিভিন্ন বাড়ীথেকে ন্যাড়াগির্জেতে। শশিভূষণ দে ষ্ট্রীটে তারা এসে জমেছিল। অধিকাংশ রথই উঁচুতে পাঁচ-ছ হাতের মধ্যে। তাতে বাঙলার দারুশিল্পের কারুকার্যের পরিচয়ও বিশেষ কিছু নেই। শুধু ফুল আর পাতা দিয়ে রথের কারুকর্মের দৈন্য ঢাকার প্রয়াসটকু দেখা যায়। কোনও কোনও রথে ব্যাটারির আলোতে সাজ-সজ্জাও হয়। অবশ্য রথের দেবতা জগন্নাথদেবের দারুমূর্তিকে বেশ সাজিয়ে গুজিয়ে বার করা হয়। মাথায় সোনার মুকুট, গলায় সোনা আর মুক্তোর মালা, পরণে হ’লদে পট্টবস্ত্রের ঘাগরা – গলার দু-পাশ দিয়ে রঙীন চাদর ঝোলানো। সবচেয়ে মজার ব্যাপার – জগন্নাথের হস্তপদহীনতা অতি প্রসিদ্ধ গুণ হ’লেও ভক্তরা রথযাত্রায় জগন্নাথকে সোনা বা রূপোর হাত পরিয়ে দেন। কোনও কোনও রথে জগন্নাথের বদলে গৃহদেবতা নারায়ণকেই বসান হয়।…

…ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের টিনের রথে জগন্নাথ-মোমের বাতি জ্বলে “জগন্নাথ মাইকী জয়” শব্দে চ’লেছেন-মহোৎসাহে।

রথের জৌলুস থাকুক আর না থাকুক মেলাটা বেশ জমজমাট হ’য়েছে। সারা রাস্তা জুড়ে রথযাত্রা উৎসবের অচ্ছেদ্য ভোজ্য পাপ’র ভাজার গন্ধ। কাঠের বড় বড় বারকোস, কেটো, আলনা, ছোট আলমারি, খড়মের আড়ত প’ড়েছে রাস্তায়। ধামা, চুপড়ি, কুলো, ব’টি, নারকেল-কুরুনি, দা, কাস্তে কুড়ুল – ঘর-গেরস্থালীর জিনিষপত্র কেনা-বেচার দারুণ ঘুম পড়ে গেছে। আর মাটির পুতুল খেলনা? বৌবাজার ষ্ট্রীটের অনেক দোকানদার আজ পুতুলওয়ালাদের বসতে দিয়েছে তাদের পশরা নিয়ে। কেষ্টনগরের কিংবা তার অনুকরণে তৈরী নানা দেবদেবীর ছোট ছোট মূর্তি। গঠন নৈপুণ্যে আর খুঁটিনাটি সজ্জায়, তারা বড় বড় মূর্তি’র চাইতে কোনও অংশে যে হীন নয় – তার সার্থক স্বাক্ষর র’য়েছে তাদের গায়ে। কিন্তু দাম? তা সাধারণ গেরস্থর নাগালের বাইরে। তাই মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে আর দামটা জিজ্ঞেস করে নিয়ে সাধারণ দর্শনার্থীর দল চলে যাচ্ছে। সোলার কাকাতুয়া আর টিয়াপাখী, টিনের ছোট রথ আর ছেলে কোলে মেয়ে পুতুল – দু’ আনা, দশ পয়সা মালের খরিদ্দার যারা, তাদের কাছে ঐ জিনিস দূর্লভ।

আর মেলা জমেছে সার্কুলার রোডে ফুল আর পাখীর বাজারে। এ মেলা দিন-চৌদ্দ থাকবে এখানে। হোগলার ছোট ছোট ঘরে পাখী আর গাছের আড়ত। নানা নার্শারি থেকে কতরকমের গাছ এসেছে। নারকেল, তাল, কলা, নানা রকমের পান, অর্কিড, ঝাউ, চাঁপা, ম্যাগনোলিয়া গ্ল্যান্ডিফ্লোরা। নাম জানা আর নাম না জানা দিশী-বিলেতী কত রকমের গাছ উদ্যানবিলাসীদের উদ্যানসজ্জার উপকরণ। কলকাতার আশে-পাশে বহু বাগানবাড়ী আছে – কলকাতাতেও বহু বড়লোক আছেন – তাঁরা কিনছেন এসব গাছ – মোটরে করে বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। সার্কুলার রোডে বুইক চলে, মরিস চলে আবার ক্যাডিলাকও মার্সেলিস চলে – পামগাছ আর চাঁপা, গ্ল্যান্ডিফ্লোরার শাখা দুলছে তাঁদের মাথায়। আর সাধারণ মধ্যবিত্ত গেরস্থও চলেছে – হাতে একটি তুলসী গাছ কিংবা বেল বা যু’ই কিংবা সূর্যমুখী বা রজনীগন্ধার একটি ছোট চারা।

পাখীর বাজারও জমেছে বেশ। সেখানে ঢুকলে মনে হবে প্রকাণ্ড একটা বনে বুঝি ঢুকেছি – এতরকম পাখীর ডাক সেখানে। ময়ূর, ময়না, কাকাতুয়া, টিয়া, হরবোলা, বৌ-কথাকও, চোখগেল, শ্যামাপাখী, বুলবল, দোয়েল – কিছু আর বাকি নেই। একসঙ্গে সবাই ধরেছে নিজের নিজের সুর! এ সমস্ত পাখীর দাম যা তা, অবশ্য সাধারণ গেরস্থর নাগালের বাইরে। তাদের পাখীর শখ মিট্ছে মুনিয়া পাখীতে। টাকায় গোটা দুয়েক মুনিয়া পাওয়া যায়। মুনিয়াগুলোর বুকে লাল, হলদে, সবুজে রঙ করে দিয়েছে মুনিয়াওয়ালা। মুনিয়ার অধিকাংশ ক্রেতা ছোট ছোট ছেলে। তারা জানে মুনিয়ার আসল রঙ ওগুলো নয়। আর মাদী মুনিয়া শিষ্ দেয় না – মদ্দা মুনিয়াই শিষ্ দেয়। তাই মুনিয়াওয়ালার সঙ্গে ওদের মুনিয়া যাচাই আর দর কষাকষিতে পাখীর মেলায় হৈ হৈ রৈ রৈ কাণ্ড!

সারাদিন মেলা জমে রাত্রি এগারোটা-বারোটা পর্যন্ত এখানে জমজমাট ভাব চলেছে সোমবার। সন্ধ্যা সাতটা-আটটা নাগাতই সে ভীড় চরম পর্যায়ে এল – যখন গেরস্থ বাড়ীর রথ আসতে লাগল আর কাঁসর ঘড়ি ঘন্টার আওয়াজের সঙ্গে ভক্তদের রথটানা আর জয়ধ্বনি সুরু হল। একদিকে আমহার্ষ্ট ষ্ট্রীট, একদিকে শশিভূষণ দে ষ্ট্রীট আর পূর্বে ও পশ্চিমে সারা বহুবাজার ষ্ট্রীট জুড়ে লোক থৈ থৈ করছে আর রৈ রৈ শব্দ উঠ্ছে মাঝে মাঝে দু’চারটে পকেটমার অপরের পকেট কেটে পালাতে গিয়ে ধরাও পড়েছে এইদিন। জনতার হাতে উত্তমমধ্যম খাবার পর তাদের থানায় নিয়ে গেছে পুলিশ।”

rath of calcutta 1955
ন্যাড়াগির্জার রথতলায় ক্ষুদে রথের মেলা ১৯৫৫ [২]
rath of calcutta 1963
কলকাতার রাজপথে রথযাত্রা ১৯৬৩ [৩]
rath of moulali calcutta 1966
মৌলালী রথের মেলা ১৯৬৬ [৪]
rath of calcutta 1971
মৌলালী রথের মেলা ১৯৭১ [৫]
rath of calcutta 1976
উত্তর কলকাতায় ছোটদের রথ ১৯৭৬ [৬]
rath of calcutta 2025
বৌবাজার রথের মেলা ২০২৫

ফিরে আসি প্রাণকৃষ্ণ দত্তের লেখায়। ওনার বিবরণে লালদীঘি থেকে বৈঠকখানা পর্যন্ত সোজা পথটিকে ১৭৫৬ সালের আপজনের (A. Upjohn) ম্যাপে Avenue leading to the Eastward উল্লেখ করা হ​য়েছে। মার্ক উডের ১৭৮৪-৮৫ সালের ম্যাপে এই রাস্তার নাম বউবাজার স্ট্রিট বা বৈঠকখানা স্ট্রিট উল্লেখ করা হয় – যা বর্তমানে বিপিনবিহারী গাঙ্গুলি স্ট্রিট (বি বি গাঙ্গুলি স্ট্রিট) নামে পরিচিত।

map a upjohn 1756
Plan of the territory of Calcutta as marked out in the year 1742, exhibiting likewise the Military operations at Calcutta when attacked and taken by Seraj ud Dowlah on 18th June 1756 – Printed and Published according to the Act of Parliament, By A. Upjohn. 2nd April 1794. – আপজন-এর ম্যাপের অংশবিশেষ [৭]

অর্থাৎ, মধ্য কলকাতার বউবাজার (বহুবাজার বা বৌবাজার) ও তার আশেপাশের অঞ্চলে রথের ঐতিহ্য প্রাচীন। এই অঞ্চলের বিখ্যাত কিছু রথযাত্রার পাশাপাশি অনেক পারিবারিক রথযাত্রাও পালন করা হয়। সপ্তদশ শতকের শেষদিকে কলকাতা শহর গড়ে ওঠার পরে মূলত রুটি-রুজির টানেই বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ এই শহরমুখী হয়। একই সাথে খুব স্বাভাবিক ভাবেই ভিন্ন আচার-সংস্কৃতির আগমনও ঘটে এই শহরে। বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত সুবর্ণবণিক পরিবারের অনেকেরই গৃহদেবতা জগন্নাথ। সুবর্ণবণিক অর্থাৎ এককথায় সোনা ও মণিমাণিক্যের ব্যবসায়ী। বর্তমানে বউবাজার অঞ্চলে, বিপিনবিহারী গাঙ্গুলি স্ট্রিটের দু’পাশে যেসব সোনার দোকান দেখা যায়, সেগুলি সুবর্ণবণিকদের দোকান। স্বাভাবিকভাবেই এখানকার আশেপাশে সুবর্ণবণিক পরিবারের আধিক্য দেখা যায়। কলকাতার আরও অনেক বাড়ির মতোই বউবাজারের বেশ কিছু সুবর্ণবণিক বাড়িতে আজও রথযাত্রা উদযাপিত হয়।

b b ganguly street kolkata
অধুনা বিপিনবিহারী গাঙ্গুলি স্ট্রিট

সুবর্ণবণিক কথা

কুঞ্জলাল ভূতির সুবর্ণবণিকের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস অনুযায়ী, বহুবছর আগে সারা ভারতবর্ষের প্রায় সর্বত্রই বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব ছিল। সেই সময় উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যার কাছে রামগড় নামক এক জায়গায় কিছু হিন্দু ব্যবসায়ী পরিবার বাস করতেন। সোনা ও মণিমাণিক্যের ব্যবসা ছিল তাঁদের। এই ব্যবসায়ীদের প্রধান ছিলেন কুশল আঢ্যের জ্যেষ্ঠ পুত্র সনক আঢ্য। তাঁর পিতৃব্য, গণপতি আঢ্য বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করায় উনি নিজ ধর্ম রক্ষার জন্য পরিবার, ব্রাহ্মণ-পুরোহিত ও ষোলো ঘর প্রধান ও ত্রিশ ঘর অপ্রধান আত্মীয়-কুটুম্ব সহ আনুমানিক দশম শতকে অবিভক্ত বাংলায় চলে আসেন। সেইসময় বাংলায় আদিশূরের রাজত্ব ছিল। ব্যবসায়ী পরিবারগুলি আদিশূরের রাজধানী, বর্তমান বাংলাদেশের বিক্রমপুরে এসে বসবাস ও ব্যবসা শুরু করলেন। সময়ের সাথে সাথে তাঁরা সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠলে, আদিশূর তাঁদেরকে সুবর্ণবণিক নামে অভিহিত করেন এবং তাঁদের বাসস্থানের নামকরণ করেন ‘সুবর্ণগ্রাম’।

প্রায় দেড়শো বছর তাঁরা সুবর্ণগ্রামে বসবাস ও ব্যবসার মাধ্যমে উন্নতিসাধন করেন। এরপর বল্লাল সেনের রাজত্বকালে, সুবর্ণবণিকদের প্রধান ছিলেন সনক আঢ্যের উত্তরপুরুষ বল্লভানন্দ আঢ্য। বল্লাল সেন তাঁর কাছ থেকে নেওয়া ঋণ শোধ না করার পরিবর্তে পুনরায় ঋণ চাইলে, তিনি তা দিতে অস্বীকার করেন। এর ফলে তাঁর সাথে বল্লাল সেনের বিরোধ বাধে এবং সুবর্ণবণিক সমাজ রাজরোষের শিকার হন। যে সুবর্ণবণিকরা আর্য বা হিন্দু সমাজের বর্ণের ভিত্তিতে শ্রেণীবিভাজনের বৈশ্যবর্ণের অন্তর্গত ছিল, বল্লাল সেনের কারণে তাঁদের শূদ্র গোষ্ঠীভুক্ত করা হয়।

এইভাবে স্বেচ্ছাচারী বল্লাল সেনের অত্যাচারে জাতিচ্যুত হয়ে সুবর্ণবণিকরা সুবর্ণগ্রাম ছেড়ে উড়িষ্যার কটক, বালেশ্বর প্রভৃতি জায়গায় ও বাংলার ঘাটাল, মেদিনীপুর ও রাঢ় অঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েন। একদল বর্ধমানের খড়গেশ্বরী বা খড়ি নদীর পাশে কর্জনায় চলে আসেন। এখানেও তাঁরা ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে উন্নতিসাধন করে প্রায় দু-তিনশো বছর বসবাস করেন। এখানেও পুনরায় রাজ-অত্যাচারের শিকার হয়ে, কর্জনা থেকে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তে থাকেন। কুলজি গ্রন্থে উল্লেখ আছে,

“চৌদ্দশত ছত্রিশ শকে ভাঙ্গিল কর্জনা,
রাজপীড়ায় পীড়িত হইল সর্বজনা।
বিশেষ বণিক সব ছিল সুখবাসী,
পরিবার সহিত হইল নানাদেশী।
নিকটে রহিল কেহ, কেহ গেল দূরে,
নিবাস নিয়ম নাই কেবা তত্ত্ব করে।”

অষ্টম শতকে প্রাচীন তাম্রলিপ্ত (তমলুক) বন্দরের অবনতির পর থেকে নবম-দশম শতক থেকে সরস্বতী নদীর তীরে সাতগাঁও বা সপ্তগ্রাম বন্দরের গুরুত্ব বাড়তে থাকে। সপ্তগ্রাম ধীরে ধীরে বাংলার অন্তর্দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিণত হতে থাকে। বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির সাথে সাথে এই বন্দরকে কেন্দ্র করে লোকালয় ও বাণিজ্যনগর গড়ে উঠতে থাকে। দেশীয় বণিকদের পাশাপাশি, বিদেশি বণিকরাও সে সময় সপ্তগ্রামে বাণিজ্য করতে আসত। কর্জনা ছেড়ে সুবর্ণবণিকরা এরপর সেদিকেই পা বাড়ালেন। সপ্তগ্রামে বসবাস ও ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে কিছুদিনের মধ্যেই তাঁদের সমৃদ্ধি বহুগুণ বৃদ্ধি পেল। এবিষয়ে কবিকঙ্কণ তাঁর চণ্ডীতে লিখেছেন,

“সপ্তগ্রামের বেনে সব কোথা নাহি যায়
ঘরে বসে সুখ মোক্ষ নানা ধন পায়।।
তীর্থ মধ্যে পুণ্যতীর্থ অতি অনুপম।
সপ্তঋষি শাসনে বলয়ে সপ্তগ্রাম।।”

সপ্তগ্রামে সুবর্ণবণিকরা যে শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যেই উন্নতি করেছিলেন, তা ন​য়। এই প্রসঙ্গে সুধীর কুমার মিত্র সপ্তগ্রামের সোনা ব্যবসায়ীদের প্রশংসা করে বলেছেন,

“সপ্তগ্রামে যাঁহারা স্বর্ণ রৌপাদি আমদানি করিতেন, তাঁহারা সুবর্ণবণিক আখ্যা লাভ করিয়া পুরুষানুক্রমে এই স্থানে একটি সম্প্রদায়ে পরিগণিত হইয়াছিলেন। উক্ত সম্প্রদায় কেবলমাত্র বাণিজ্যব্যবসায়াদি ঐহিক বিষয়েই যে উন্নতি লাভ করিয়াছিলেন তাহা নহে, পারত্রিক পরমার্থিক বিষয় চিন্তনেও তাঁহারা অগ্রগামী ছিলেন।”

চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতক পর্যন্ত সময়কে বিনয় ঘোষ সপ্তগ্রামের স্বর্ণযুগ বলেছেন। সপ্তগ্রামে থাকাকালীন আর্থিক উন্নতির পাশাপাশি, সুবর্ণবণিকরা বৈষ্ণব ধর্মের দীক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে বল্লাল সেনের অত্যাচারে হারানো সামাজিক মর্যাদা ফিরে পান! উদ্ধারণ দত্ত ঠাকুর তাঁদের উদ্ধার করেন। সে কথায় পরে আসব। যাইহোক, এরপর সরস্বতী নদীর নাব্যতা হ্রাসের সাথে বাণিজ্যের সুবিধা কমতে থাকায় সপ্তগ্রাম বন্দরের গুরুত্ব কমতে থাকে। ষোড়শ শতকের পর সপ্তগ্রামের অবনতি ঘটে – হুগলি বন্দরের গুরুত্ব বাড়তে থাকে। সুবর্ণবণিকরা এবার হুগলি নদীর দুই তীরে অম্বিকা, কালনা, বাঁশবাটি, হুগলি, চুঁচুড়া, চন্দননগর, শ্রীরামপুর, নৈহাটি, হালিশহর, কুমারহাটি, পান্ডুয়া, মহানাদ, জিরাট, বলাগড়, দ্বারবাসিনী প্রভৃতি জায়গায় ছড়িয়ে যান। অষ্টাদশ শতক থেকে হুগলি নদীর নাব্যতা কমার মাধ্যমে হুগলি বন্দরের গুরুত্ব কমতে থাকে। ইতিমধ্যে সপ্তদশ শতকের শেষদিকে ইংরেজ বণিকরা কলকাতায় তাদের বাণিজ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে – কলকাতাকে ঘিরে গড়ে ওঠে প্রধান বাণিজ্যনগর। মূলত ব্যবসার উন্নতির জন্য সুবর্ণবণিকরা এরপর বিভিন্ন জায়গা থেকে কলকাতায় এসে বসবাস করতে থাকেন।

আদিশূরের কিংবদন্তী

কুঞ্জলাল ভূতির সুবর্ণবণিকের ইতিহাস আলোচনার মূল ভিত্তি ছিল লোকশ্রুতি ও বিভিন্ন কুলজি গ্রন্থ। উচ্চবর্ণের হিন্দুদের বংশবৃত্তান্ত হিসেবে পরিচিত এই কুলজি গ্রন্থগুলি, তথ্যের নিরিখে পরস্পরবিরোধী ও অসঙ্গতিতে পূর্ণ। যে আদিশূরের রাজত্বে সুবর্ণবণিকরা বাংলায় এসেছিলেন, তাঁর আসল পরিচয় ও সময়কাল সম্পর্কে কুলজিতে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। কুলজি গ্রন্থ অনুসারে আদিশূরের নাম বাংলার কৌলিন্য প্রথার সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। আদিশূরের মাধ্যমে বাংলাতে ব্রাহ্মণদের আগমনের যে কাহিনি কুলজিগুলিতে লেখা আছে, সেগুলোতেও প্রচুর তথ্যের অমিল দেখা যায়। তাছাড়া আদিশূরের আনুমানিক সময়ের অনেক পরে, ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে এই গ্রন্থগুলি লেখা শুরু হয়। অথচ কুলপঞ্জিকা বা কুলজি গ্রন্থ ছাড়া আর কোথাও আদিশূরের উল্লেখ পাওয়া যায় না। এইসব কারণে ঐতিহাসিক ও গবেষকদের অনেকেই কুলজি গ্রন্থগুলিকে ইতিহাসের উপাদান হিসেবে মান্যতা দিতে নারাজ এবং আদিশূরের অস্তিত্ব সম্পর্কে সন্দিহান। সুতরাং আদিশূর সম্পর্কে এই আলোচনা এখানে খুবই প্রাসঙ্গিক।

ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার কুলজি গ্রন্থগুলিকে ইতিহাসের উপাদান হিসেবে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছেন। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ও কুলজি গ্রন্থের ঐতিহাসিক প্রমাণের সত্যতা সম্বন্ধে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তবে গ্রন্থগুলিতে প্রচুর তথ্যের অসঙ্গতি সত্ত্বেও, কিছু ঐতিহাসিক আদিশূরকে বিভিন্ন ঐতিহাসিক চরিত্র হিসেবে প্রমাণ করতে সচেষ্ট হয়েছেন। প্রমোদলাল পাল, দুধপানি শিলালিপিতে উল্লিখিত মগধের রাজা আদিসিংহ ও আদিশূরের এক হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলেছেন। রমাপ্রসাদ চন্দ, আদিশূরকে রণশূরের ছেলে বা নাতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। দীনেশচন্দ্র সরকার একদিকে আদিশূরকে পালদের সামন্তরাজা হওয়ার সম্ভাবনার কথা বললেও, চোলরাজ অরিন্দমের কাহিনির সাথে আদিশূরের কাহিনির মিল থাকায়, সেন আমলে অরিন্দমের কাহিনি বাংলায় প্রবেশ করে কুলজি গ্রন্থে আদিশূরের কাহিনি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। এছাড়া ব্যোমকেশ মুস্তফী গৌড়রাজ জয়ন্ত ও আদিশূরকে অভিন্ন ব্যক্তি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন। আবার নগেন্দ্রনাথ বসু আরও এক ধাপ এগিয়ে, আদিশূরকে একটি উপাধি হিসেবে বর্ণনা করেছেন,

“…‘আদিশূর’ ব্যক্তিবিশেষের নাম নহে। মুসলমান-আগমনের পূর্ব্বে বিভিন্ন সময়ে যে যে হিন্দু-নৃপতি হিন্দুসমাজ-সংস্কারে মনোযোগী হইয়াছেন, কুলগ্রন্থকারগণ সেই সেই নৃপতিকেই আদিশূর নাম দিয়া গৌরবান্বিত করিয়াছেন। তন্মধ্যে রাঢ়ীয় ও বারেন্দ্র ব্রাহ্মণগণের বীজপুরুষ ক্ষিতীশ, তিথিমেধা, বীতরাগ, সুধানিধি ও সৌভরি পঞ্চগোত্রীয় এই পঞ্চ ব্রাহ্মণ যাঁহার যজ্ঞ করিতে আসেন, তিনিই ১ম আদিশূর। পূর্ব্বেই বলিয়াছি, ‘আদিশূর’ একটী উপাধি। গৌড়াধিপ জয়ন্তই রাঢ়ীয়-কুলমঞ্জরীমতে ১ম আদিশূর বলিয়া পরিচিত।”

নীহাররঞ্জন রায় কুলজি গ্রন্থগুলিকে ইতিহাস-আলোচনায় নির্ভরযোগ্য নয় বললেও, এগুলির সামাজিক গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন,

“…কুলশাস্ত্রের সাক্ষ্য ঐতিহাসিক আলোচনায় নির্ভরযোগ্য বলিয়া মনে হয় না। তবে, ইহাদের ভিতর দিয়া লোকস্মৃতির একটি ঐতিহাসিক ইঙ্গিত প্রত্যক্ষ করা যায়, এবং সে ইঙ্গিত অস্বীকার করা কঠিন। পঞ্চদশ-ষোড়শ-সপ্তদশ শতকে যে বর্ণ-উপবর্ণগত সমাজ ব্যবস্থা, যে-স্মৃতিশাসন বাঙলাদেশে প্রচলিত ছিল তাহার একটা প্রাচীনতর ইতিহাস ছিল এবং লোকস্মৃতি সেই ইতিহাসকে যুক্ত করিয়াছিল শূর, সেন ও বর্মণ রাজবংশগুলির সঙ্গে—পাল, চন্দ্র বা অন্য কোন রাজবংশের সঙ্গে নয়, ইহা লক্ষণীয়।…কুলশাস্ত্রগুলির ঐতিহাসিক ইঙ্গিতটুকু মাত্রই গ্রাহ্য়, তাহাদের বিচিত্র খুঁটিনাটি তথ্য় ও বিবরণগুলি নয়।”

তারাপদ সাঁতরা কুলজির গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন,

“আমাদের দেশে বর্ধিষ্ণু বেশ কিছু পরিবারে যেসব পারিবারিক কুলুজি বা বংশলতিকা সংরক্ষিত হয়েছে, সেগুলির মধ্যে তৎকালীন ভৌগোলিক বিবরণ ও সামাজিক ইতিহাস তথা ঘটনাবলির বেশ কিছু নিহিত উপাদান ও তথ্যকে আধুনিককালের ইতিহাস রচয়িতারা কোনো গুরুত্ব দিতে চান না বা এর ঐতিহাসিকতাকে সোজাসুজি অস্বীকার করতেও দ্বিধা করেন না। তবে একথা সত্য যে, পারিবারিক এসব কুলপঞ্জিকায় সেইসব পরিবারের গৌরবগাথা-সম্পর্কিত বিবরণ ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে এমনভাবে পরিবেশন করা হয়, যার ফলে সেটির সত্যতা নির্ণয় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাহলেও সেসব অতিরঞ্জিত পারিবারিক তথ্যের মধ্যে এমন কিছু ঐতিহাসিক বা সামাজিক ধ্য়ানধারণার উপাদান জীবাশ্মের (ফসিল) মতো আত্মগোপন করে থাকে, যার সরেজমিন অনুসন্ধানের ভিত্তিতে ও জনশ্রুতির আলোকে মর্মোদ্ধার করতে পারলে, সেটি ক্রমে সামাজিক বা স্থানীয় ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে এক অপরিহার্য উপাদান হয়ে পড়ে। তা ছাড়া, এগুলির যে একেবারেই কোনো ঐতিহাসিক মূল্য নেই, তা নয়। এর যে যথেষ্ট মূল্য আছে তার কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে, কুলুজিতে উল্লিখিত বংশের উৎপত্তি ও প্রতিপত্তি-সম্পর্কিত পরস্পর বিরোধী বক্তব্য়কে বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করলে তার মধ্যে অনেক প্রামাণিক ও গুরুত্বপূর্ণ গোপন তথ্য়ের ইঙ্গিতও পাওয়া যেতে পারে।”

কুলজি গ্রন্থগুলির সামাজিক গুরুত্ব আছে ঠিকই। তবে সমস্যা হল, সময়ের সাথে সাথে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে বা অন্য কারণে প্রকৃত তথ্যের পরিবর্তন বা বিকৃতির সম্ভাবনাও থেকে যায়। তাই এগুলিকে ঐতিহাসিক উপাদান হিসেবে গ্রহণের এই ঝুঁকিটুকু থেকেই যায়। অন্যান্য উপযুক্ত প্রমাণের অভাবেই ঐতিহাসিক ও গবেষকদের এগুলির ওপর নির্ভর করতে হয়। অন্তত যতদিন না নতুন কোনও তথ্যের সন্ধান মিলছে, ততদিন। তবে যে সময়ের কথা অনুমান করা হচ্ছে, সেই সময়-সম্পর্কিত নতুন তথ্য আবিষ্কারের সম্ভাবনা কম। সুতরাং সুবর্ণবণিক বা আদিশূরের এইসকল কথা আমাদের কিছুটা কুলজি কাহিনির অনুমানের ওপর নির্ভর করেই গ্রহণ করতে হবে।

চুনিমণি দাসীর ঠাকুরবাড়ির অতীত ও বর্তমান

সেন্ট্রাল মেট্রো স্টেশনের ছ’নম্বর গেট দিয়ে বেরিয়ে বাঁদিকে ঘুরে ড. ললিত ব্যানার্জি সরণি ধরে সোজা এগিয়ে গিয়ে কলেজ স্ট্রিট পার করলেই পড়বে প্রেমচাঁদ বড়াল স্ট্রিট। আরও একটু এগিয়ে বাঁদিকের সরু গলিটি গোবিন্দ সেন লেন। এই রাস্তার ৬/১ নম্বর বাড়িটিই চুনিমণি দাসীর ঠাকুরবাড়ি। বাড়িটি মধ্য কলকাতার বউবাজার** অঞ্চলের অন্তর্গত।

Chunimoni dasi thakurbari
চুনিমণি দাসীর ঠাকুরবাড়ি – ৬/১ গোবিন্দ সেন লেন, কলকাতা

শ্রীপাট অম্বিকা কালনার সিদ্ধ বৈষ্ণব শ্রীমদ ভগবানদাস বাবাজীর প্রিয় শিষ্য বৈদ্যনাথ দে-র সহধর্মিণী ছিলেন চুনিমণি দাসী। ওনার বাবা বদনচন্দ্র চন্দ্র ও মা ক্ষেত্রমণি দাসীর আদি বাড়ী ছিল জোড়াসাঁকো। ওনাদের বড় মেয়ে ছিলেন চুনিমণি দাসী ও দুই ছেলে মহেন্দ্রচন্দ্র চন্দ্র ও রাজেন্দ্রচন্দ্র চন্দ্র। চুনিমণি দাসীর ছোটো ভাই ড. রাজেন্দ্রচন্দ্র, চিকিৎসক হিসেবে দেশের পাশাপাশি ইংল্যান্ডেও সমানভাবে সম্মানিত হয়েছেন। তিনি বিলেতে যান ও খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেন। উচ্চ চিকিৎসা পরীক্ষার (এমআরসিপি) প্রতিযোগিতায় সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করে তিনি ইংল্যান্ডের লর্ড চ্যান্সেলর হার্ডিঞ্জ স্ট্যানলি গিফার্ডের বোন মেরী লিফেন গিফার্ডকে বিয়ে করেন। চুনিমণি দাসীর স্বামী বৈদ্যনাথ বাবু ‘মধুসূদন মল্লিক অ্যান্ড কোং’ নামক জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানের অংশীদার ছিলেন। সংসারী হলেও ধর্মকর্ম, দানধ্যান, ও হরিনাম-সংকীর্তনে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই সর্বদা নিযুক্ত থাকতেন। ১৮৯১ সালে বৈদ্যনাথ বাবুর মৃত্যু হয় ও চার বছর পরে ১৮৯৫ সালে ইংল্যান্ডে, ড. রাজেন্দ্রচন্দ্রের মৃত্যু হয়। ড. চন্দ্রের মৃত্যুর পর তাঁর পরিত্যক্ত সম্পত্তির অর্ধাংশ চুনিমণি দাসী উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেন ও প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে, ১৯০১ সালে (১৩০৭ বঙ্গাব্দের ২১শে মাঘ), তাঁর বাসস্থান ৭০, শ্রীগোপাল মল্লিক লেনের কাছে গোবিন্দ সেন লেনে পাঁচ কাঠা জমির ওপর দ্বিতল এই ঠাকুরবাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন। মন্দির প্রতিষ্ঠার সময় চুনিমণি দাসী তার জীবিত তিন ছেলেকে (গৌরমোহন দে, সাতকড়ি দে ও তিনকড়ি দে, প্রথম ছেলে নরসিংহচন্দ্র দে তখন মৃত) ট্রাস্টি এবং সেবায়েত হিসেবে নিযুক্ত করেন। তবে তাঁর ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি ও সেবামূলক কাজের কারণেই, গৌরমোহন দে-ই ছিলেন এই ঠাকুরবাড়ির প্রথম ও প্রধান ট্রাস্টি এবং সেবায়েত।

baidyanath dey
বৈদ্যনাথ দে
Chunimani Dasi
চুনিমণি দাসী
Rajendrachandra Chandra
ড. রাজেন্দ্রচন্দ্র চন্দ্র

ঠাকুরবাড়িতে প্রবেশের মুখেই সাবেকিয়ানার ছাপ চোখে পড়ে। সদর দরজার দুই পাশে রয়েছে দুটি পুরনো গ্যাসবাতির কাঠামো। বাড়িটি পশ্চিমবঙ্গের হেরিটেজ কমিশনের অধীনে একটি গ্রেড-ওয়ান হেরিটেজ। নীল রঙের গোলাকার হেরিটেজ ফলকটি রয়েছে দরজার বাঁদিকের দেওয়ালে। ডানদিকের দেওয়ালে রয়েছে শ্বেতপাথরের একটি প্রতিষ্ঠা ফলক। দ্বিতল বাড়িটির বাইরের দেওয়াল জুড়ে সুন্দর পঙ্খের কাজ লক্ষ্য করা যায় – প্রবেশদ্বারের উপরেও রয়েছে সুদৃশ্য পঙ্খের কাজ। দেওয়ালে আছে বেশ কয়েকটি খড়খড়ি দেওয়া বড় আকৃতির জানলা ও প্রত্যেকটির ওপরে রঙবেরঙের কাঁচের অর্ধ-গোলাকার নকশা। বাড়ির বাইরে সরু গলির সাথেই গা ঘেঁষে রয়েছে রোয়াক।

ঠাকুরবাড়িতে প্রবেশ করলে প্রথমেই আছে মস্ত এক মন্দির প্রাঙ্গন। এই প্রাঙ্গন ঘিরে অনেকগুলি চকমিলানো ঘর আছে। একতলার বাঁদিকের দেওয়ালে রয়েছে আরও একটি শ্বেতপাথরের প্রতিষ্ঠা ফলক। দোতালাতেও, একতলার মত চকমিলানো ঘর আছে। দোতালার বারান্দায় নকশাযুক্ত ঢালাই লোহার রেলিং দেখা যায়। মন্দির প্রাঙ্গনের পর কয়েক ধাপ সিঁড়ি পেরিয়ে তিনখিলানবিশিষ্ট, পশ্চিমমুখী, অলিন্দযুক্ত মন্দির। অলিন্দের সামনে তিনখিলানবিশিষ্ট ঢালাই লোহার সুন্দর জাফরিকাটা স্থাপত্য। গর্ভগৃহের সামনে তিনটি খিলানের উপর ও অলিন্দের সামনের জাফরির উপর সুন্দর পঙ্খের কাজ আছে। মন্দিরের গর্ভগৃহ ও অলিন্দের মেঝেতে সাদা-কালো মার্বেল বসানো।

Chunimoni dasi thakurbari
ঠাকুরবাড়ির বাইরের অংশ
Chunimoni dasi thakurbari
বাইরের দেওয়ালে পঙ্খের কাজ
Chunimoni dasi thakurbari
ঠাকুরবাড়ির প্রতিষ্ঠা ফলক

জগন্নাথ ও রাধাগোবিন্দের দারুবিগ্রহ এই বাড়ির প্রধান পূজ্য দেবতা। বাঁদিকের গর্ভগৃহের দরজার উপরে লেখা ‘শ্রী শ্রী জগন্নাথদেব জীউ’। অর্থাৎ এখানে একক জগন্নাথদেবের অধিষ্ঠান। মাঝের গর্ভগৃহের দরজার উপরে লেখা ‘শ্রী শ্রী রাধাগোবিন্দদেব জীউ’। এখানে রাধাগোবিন্দের অধিষ্ঠান। সাথে তিনটি শালগ্রাম শিলা ও একটি দারুনির্মিত গরুড় মূর্তি দেখা যায়। শেষ অর্থাৎ ডান দিকের গর্ভগৃহের দরজার উপরে লেখা ‘শ্রী শ্রী কৃষ্ণচৈতন্যদেব জীউ’। যদিও এই দরজাটি বন্ধ থাকে।

Chunimoni dasi thakurbari
শ্রী শ্রী রাধাগোবিন্দদেব জীউ

গৌরমোহন দের পাঁচ পুত্রের একজন কৃষ্ণদাস দে কলকাতা সুবর্ণবণিক সমাজের একজন বিশিষ্ঠ কর্মী ছিলেন। তাঁর পুত্র তুলসীদাস দে, দীর্ঘ ৩৫ বছর এই ঠাকুরবাড়ির সেবায়েত নিযুক্ত ছিলেন। ২০২১ সালের মে মাসে তাঁর মৃত্যুর পর থেকে তাঁর দুই পুত্র, তপন কুমার দে ও রাজ কুমার দে এই বাড়ির বর্তমান সেবায়েত। ওনারা চুনিমণি দাসীর পঞ্চম প্রজন্ম। গোবিন্দ সেন লেনের ২এ নম্বর বাড়িটির নাম গৌর অমৃত ধাম – এটাই বর্তমান দে পরিবারের বসতবাড়ি।

Chunimoni dasi thakurbari
দে পরিবারের বসতবাড়ি – ২এ গোবিন্দ সেন লেন, কলকাতা
Chunimoni dasi thakurbari
বসতবাড়ির প্রতিষ্ঠা ফলক

দে পরিবারের একক জগন্নাথ

এই ঠাকুরবাড়ির জগন্নাথ বিগ্রহটি খুবই সুন্দর। শোনা যায়, পুরীর নবকলেবরের সময় অবশিষ্ট নিমকাঠ দিয়ে বিগ্রহটি তৈরি হয়েছিল। এছাড়াও এই বিগ্রহের ভেতরে শালগ্রাম শিলা আছে বলেও শোনা যায়। মূর্তিটি উচ্চতায় প্রায় সাড়ে তিন ফুট। প্রতি বছর স্নানযাত্রার পর জগন্নাথদেবের অঙ্গরাগ হয়। বিগ্রহটি নির্মাণ করেছেন হাওড়ার আমতার বিনোলা জয়পুরের দারুবিগ্রহের শিল্পী প্রয়াত বিহারীলাল কুণ্ডু। একই পরিবারের শিল্পী প্রয়াত হীরালাল কুণ্ডু পরবর্তীকালে অঙ্গরাগ করতেন। বর্তমানে শিল্পী অশোক কুণ্ডু বংশপরম্পরায় বিগ্রহের অঙ্গরাগ করেন।

পুরীর মন্দিরে জগন্নাথদেবকে যেমন বলরাম, সুভদ্রার সাথে দেখা যায়, এখানে কিন্তু সেরকম নয় – এই বাড়িতে জগন্নাথ একা পূজিত হন। আসলে বউবাজারের আশেপাশে যেসকল সুবর্ণবণিক পরিবারে রথযাত্রা পালিত হয়, তাদের বেশিরভাগ বাড়িতেই একক জগন্নাথের উপস্থিতি দেখা যায়। গবেষক সোমা মুখোপাধ্যায় সুবর্ণবণিকদের একক জগন্নাথের এক সুন্দর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এই একক জগন্নাথকে উনি ‘দধিবামন’ বা ‘পতিত পাবন’ বলেছেন। ভাদ্র মাসে একক জগন্নাথকে দধিবামন রূপে আরাধনা করা হয়। ‘পতিত পাবন’ অর্থে জগন্নাথ, যিনি পতিত অর্থাৎ দীন-দুঃখীকে জাগতিক দুঃখ-কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। শ্রীচৈতন্যদেব ভক্তি আন্দোলনের মাধ্য়মে ঈশ্বরের উপাসনার মধ্য় দিয়ে, জাতপাত ও ধর্মীয় গোঁড়ামি দূর করে আধ্যাত্মিক মুক্তি ও সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। এই আন্দোলনের প্রচারের উদ্দেশ্যে নিত্যানন্দ প্রভু সপ্তগ্রামের দিবাকর দত্তের বাড়িতে প্রায় তিন মাস বসবাস করেন। দিবাকর দত্তের পূর্বপুরুষ সপ্তগ্রামে বসবাসকারী সুবর্ণবণিক ছিলেন, বল্লাল সেনের রাজরোষে যারা সামাজিক অবস্থানে বৈশ্য থেকে শূদ্রের পর্যায়ে নেমে আসেন। দিবাকর সহ সপ্তগ্রামের সমস্ত সুবর্ণবণিক, নিত্যানন্দের থেকে বৈষ্ণব ধর্মের দীক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে, সমাজে তাদের হারানো গৌরব ফিরে পান। এইভাবে একটি জাতিকে দিবাকর দত্তের মাধ্যমে উদ্ধার করার কারণে নিত্যানন্দ, তাঁর নামকরণ করেছিলেন ‘উদ্ধারণ দত্ত’ –

“প্রভু হাসি হাসি কহে বণিক্কুমার।
বণিক্কুল তোমা হৈতে হইল উদ্ধার॥
দিবাকর করি নাম না পুছিবে কেহ।
আজি হৈতে মোর দত্ত নাম তুমি লহ॥
বণিক্কুল উদ্ধার করিলি বটে সে কারণ।
আজ হৈতে তোর নাম রহুঁ উদ্ধারণ॥”

চৈতন্যচরিতামৃত অনুসারে, শ্রীচৈতন্যদেব তাঁর আরাধ্য একক শ্রীকৃষ্ণকে জগন্নাথদেবের মধ্যে দর্শন করেছিলেন। তাই বাসুদেব ঘোষ তাঁর পদে বলেছেন, “যেই গৌর সেই কৃষ্ণ সেই জগন্নাথ”। নিত্যানন্দের সংস্পর্শে উদ্ধারণ দত্তের মাধ্যমে সুবর্ণবণিকদের বহু বছরের হারানো সামাজিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার যে বৈষ্ণবধর্ম গ্রহনের ফলে সম্পন্ন হয়েছিল, সেই ধর্মের মূল প্রচারক চৈতন্যদেব জগন্নাথের মধ্যে একক শ্রীকৃষ্ণের দর্শন পান। এই কারনেই বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত অধিকাংশ সুবর্ণবণিক পরিবারের আরাধ্য ‘একক জগন্নাথ’।

jagannath
একক জগন্নাথ

জগন্নাথের রথ

জগন্নাথ বিগ্রহের মতো দে বাড়ির রথটিও সমান আকর্ষণীয়। বউবাজারের এখনও টিকে থাকা সাবেকি রথের মধ্যে এই রথটি অন্যতম। পূর্বে উল্লেখিত কুণ্ডু পরিবারের শিল্পীরাই এই রথটি নির্মাণ করেছিলেন। আনুমানিক কুড়ি ফুট উচ্চতার পাঁচ-চূড়াবিশিষ্ট প্রাচীন এই রথ, বাংলার দারুশিল্পের (কাঠের শিল্প) একটি উৎকৃষ্ট নিদর্শন। রথের শিল্পকর্ম যে নির্মাতা শিল্পীদের দক্ষতার পরিচয় বহন করে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। লাল, গাঢ় সবুজ, সামান্য হলুদ ও সাদা রঙের কারুকার্য করা রথটির সামনে রয়েছে দুটি সাদা ঘোড়া। দোতলায় ঘোড়ার পেছনে আছে একজন সারথি। এই দোতলাতেই রথের দেওয়াল জুড়ে আঁকা রয়েছে নানাবিধ দেবদেবীর ছবি। একই তলায় চারদিকে আছে চারটি মূর্তি বা পুতুল – কপালে তিলক ও হরিনামের বটুয়া হাতে বৈষ্ণব, ঘটি হাতে পৈতেধারী বামন, অস্ত্র হাতে পুলিশ ও দ্বাররক্ষী। তিনতলায় মধ্য চূড়ার কক্ষে জগন্নাথদেবকে রথের সময় অধিষ্ঠান করানো হয়। মধ্য চূড়ার মাথায় আছে একটি গরুড় পাখি। রথটিকে ডানে-বামে ঘোরানোর জন্য এর নিচে একটি কম্পাস আছে বলেও জানা যায়। বর্তমানে তিন তলা বিশিষ্ট এই রথ, এক সময় চার তলার ছিল বলে জানা যায়।

Chunimoni dasi thakurbari rath
বৈষ্ণব
Chunimoni dasi thakurbari rath
বামন
Chunimoni dasi thakurbari rath
পুলিশ
Chunimoni dasi thakurbari rath
দ্বাররক্ষী
Chunimoni dasi thakurbari
চুনিমণি দাসীর ঠাকুরবাড়ির রথ
Chunimoni dasi thakurbari
রথে অধিষ্ঠিত জগন্নাথ
Chunimoni dasi thakurbari rath
Chunimoni dasi thakurbari rath
Chunimoni dasi thakurbari rath
Chunimoni dasi thakurbari rath

রথযাত্রা

জগন্নাথদেবের রথযাত্রা চুনিমণি দাসীর ঠাকুরবাড়ির প্রধান উৎসব। তাই অতীতের মতো আজও বেশ ঘটা করেই পালন করা হয় সোজা ও উল্টোরথ। প্রধান উৎসব এই দু’দিনের হলেও আয়োজন শুরু হয় জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রা অর্থাৎ জ্যৈষ্ঠ মাসের পূর্ণিমা তিথি থেকে। এই দিনটিকে জগন্নাথের জন্মতিথি হিসেবে মনে করা হয়। স্নানযাত্রার পর চোদ্দ দিনের অনবসর কাটিয়ে অমাবস্যা তিথিতে নবযৌবনের রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেন প্রভু জগন্নাথ। এই সময় অঙ্গরাগ হয়। অঙ্গরাগ মানে, এক কথায় বিগ্রহকে রং করে নতুন রূপে ফুটিয়ে তোলা।

Jagannath
নবযৌবন রূপ [৮]

রথের সময় এই বাড়িতে পুরী থেকে পান্ডা আসেন। রথের দিন জগন্নাথদেবকে গর্ভগৃহ থেকে বার করে ঠাকুরদালানে এনে প্রথমে ধুতি, চাদর, ফুলের মুকুটে সুসজ্জিত করে, বিভিন্ন নিয়মনিষ্ঠা মেনে পুজো করা হয়। নির্দিষ্ট ঘর থেকে বের করে বাড়ির প্রাঙ্গণে রাখা রথটিরও পুজো হয়। এরপর যজ্ঞ এবং আরতীর মাধ্যমে জগন্নাথের পুজো সম্পন্ন হলে, পরিবারের সদস্যদের সাথে নিয়ে, পুরোহিত জগন্নাথদেবকে কোলে করে ঠাকুরদালান থেকে নামিয়ে এনে, ‘জগন্নাথ স্বামীকি, জয়’ ধ্বনি দিতে দিতে রথের চারিদিকে প্রদক্ষিণ করেন। পুরোহিত ও পরিবারের সদস্যদের সাথে সাথে রথ দেখতে আসা ভক্তগণের অনেকেই প্রদক্ষিণ করতে থাকেন। প্রদক্ষিণ শেষে পুরোহিত, রথের তিন তলার মধ্য চূড়ার কক্ষে জগন্নাথদেবকে তুলে দেন। এরপর তাঁকে ফুল ও তুলসীর মালা পরানোর পর, বাড়ির উঠোনেই রথ টানা হয়। সুতরাং পুরী বা অন্যান্য অনেক জায়গায় রথের দিন জগন্নাথের মাসী বাড়ি যাওয়ার রীতি এই বাড়িতে নেই।

বর্তমানে দে পরিবারের এই রথের গতিবিধি বাড়ির উঠোনে সীমাবদ্ধ হলেও, একসময় এই রথ বাড়ির বাইরেও টানা হত। তপনবাবু জানালেন, একসময় এই রথ নগর ভ্রমণে বেরোত। এখন মূলত বিপুল খরচের সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখেই রথকে আর বাইরে বের করা সম্ভব হয় না। আজ থেকে ৪০ বছর আগে রথ শেষবার বাড়ির বাইরে বের করা হয়েছিল। সেইসময় জগন্নাথদেব রথে করে নগর ভ্রমণে বের হয়ে বাড়িতে বাড়িতে ‘দ্বার ভোগ’ গ্রহণ করতেন। রথের আগে থেকে পরিবারের আত্মীয় এবং পাড়া প্রতিবেশীরা জগন্নাথদেবকে তাঁদের বাড়িতে আমন্ত্রন জানিয়ে যেতেন। নগর ভ্রমণে জগন্নাথ সেইসব বাড়ির দরজা বা দ্বারে গিয়ে সেবা বা ভোগ গ্রহণ করতেন। রথ বাড়ির বাইরে বেরোনো বন্ধ হওয়ার পর থেকে ভক্তরা মন্দিরে এসে দ্বারভোগ নিবেদন করে যান রথে অবস্থানকারী জগন্নাথদেবকে। এছাড়াও তপনবাবু, ‘ছবি ভোগ’-এর কথা জানালেন। যা একসময় এই বাড়িতে প্রচলন ছিল। ছবি ভোগ হল, পরিবারের পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে, তাঁদের ছবির সামনে ভোগ নিবেদন।

রথ টানার পর আসে প্রসাদ বিতরণের পালা। রথ দেখতে আসা সকলেই মন্দিরের চারপাশের দালানে বসে প্রসাদ গ্রহণ করেন। প্রসাদে থাকে নানা ধরনের পদ। যেমন অন্ন, পাঁচ ভাজা, খিচুড়ি, তরকারি, পোলাও, আলুর দম, চাটনি, পায়েস, মালপোয়া প্রভৃতি। দুপুর থেকে সন্ধ্যের পরেও চলে প্রসাদ বিতরণ। রাতের দিকে জগন্নাথদেবকে রথ থেকে নামিয়ে পুনরায় গর্ভগৃহে তাঁর নিজ সিংহাসনে অধিষ্ঠান করানো হয়। সোজা রথের পরের সাতদিন জগন্নাথদেবের পুজো-অর্চনা চলে। এই কদিন জগন্নাথদেবের দুই বেশে পুজো হয় – রাজবেশ ও বামনবেশ। রাজবেশে, জগন্নাথকে উজ্জ্বল রঙের কাপড় পরানো হয়। বামনবেশে তাঁর হাতে থাকে ভিক্ষার ঝুলি আর মাথায় দেওয়া হয় ছাতা। দুই বেশেই প্রভুকে রুপোর হাত পরানো হয়।

Jagannath Rajbesh
রাজবেশ [৯]
Jagannath Bamonbesh
বামনবেশ [১০]

সোজা রথের সাতদিন পরে উল্টোরথেও একই ভাবে পুজো, জগন্নাথদেবকে রথে অধিষ্ঠান, রথ টানা, প্রসাদ বিতরণ করা হয়। ওইদিন রাতে জগন্নাথদেবকে রথ থেকে নামিয়ে পুনরায় গর্ভগৃহে তাঁর নিজ সিংহাসনে অধিষ্ঠানের মাধ্যমে রথযাত্রার পরিসমাপ্তি ঘটে।

রথ উপলক্ষে প্রতি বছর এই বাড়িতে প্রচুর লোকসমাগম হয় – পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ছাড়াও বহু মানুষ আসে এই বাড়িতে। উৎসবে লোকসমাগমে সামাজিক মেলবন্ধন সুদৃঢ় হয়। শতবর্ষের বেশি সময় ধরে চলে আসা রীতি এই পার্শ্ববর্তী লোকালয় ও জনমানসে সাংস্কৃতিক প্রভাব ফেলতে বাধ্য। এর থেকেই বোধহয় জন্ম নেয় ভক্তি ও বিশ্বাস। তপনবাবু জানালেন,

Tapan Kumar Deyঅনেকের বাড়িতে যেমন দুর্গাপুজোটা একটা বিশাল ব্যাপার, আমাদের বাড়িতে দুর্গাপুজো মানে হচ্ছে রথ! আমরা সারা বছর অপেক্ষা করে থাকি, যাতে আবার পরের বছর রথ হবে। এটা আমরা ছোটবেলা থেকে দেখে দেখে অভ্যস্ত এবং এটাতে আমাদের প্রচণ্ড আনন্দ [হয়]। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন আসে। আমরা সবাই একত্রিত হই, মিলিত হই, আনন্দ হয়, ভোগরাগ হয়, সেটা সবাই মিলে আমরা খাই।

…এই ঠাকুরবাড়ির জগন্নাথ ও রাধাকৃষ্ণ খুবই জাগ্রত। আজও পাড়া-পড়শি ও অনেক দূর দূর থেকে লোক আসছে এবং আমি যেটা দেখেছি, স্বচক্ষে, যে ঠাকুরের কাছে কিছু মানত করলে সেটা সফল হয়েছে। তার জন্যে পুজো দিতে আসে, ভোগ খায়।

Jagannath
রথের দিনে জগন্নাথ [১১]
Jagannath
রথের বেশে জগন্নাথ [১২]
Chunimoni dasi thakurbari
উল্টোরথ: রথ টানার আগের পুজো
Chunimoni dasi thakurbari
উল্টোরথ: রথ টানার আগের পুজো
Chunimoni dasi thakurbari
উল্টোরথ: রথের চারিদিকে জগন্নাথদেবের প্রদক্ষিণ
Chunimoni dasi thakurbari
উল্টোরথ: রথে অধিষ্ঠানের পর
Chunimoni dasi thakurbari
উল্টোরথ: রথ টানার সময়
Dey Family of Chunimoni dasi thakurbari
বর্তমান দে পরিবার [১৩]

গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫-এ, চুনিমণি দাসীর ঠাকুরবাড়ির রথযাত্রা ১২৫ বছরে পড়েছিল। কিঞ্জল বোসের একটি ব্লগের মাধ্যমে এই বাড়ির খোঁজ পেয়ে আমার ভাগ্নেকে জানিয়েছিলাম। ও রথের দিন (২৭শে জুন ২০২৫) ঠাকুরবাড়িতে গিয়ে রথযাত্রা দেখে এসেছিল। আমি দু’দিন পরে (২৯শে জুন ২০২৫) ওনাদের বাড়িতে গিয়ে অনেকটা সময় কাটাই। তপনবাবু ও রাজবাবুর সাথে ঠাকুর পরিবারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হয়। এরপর উল্টোরথের দিনে (৫ই জুলাই ২০২৫), ঠাকুরবাড়ির রথযাত্রা দেখার ও প্রসাদ গ্রহনের সৌভাগ্য হয়।

এই বছর চুনিমণি দাসীর ঠাকুরবাড়ির রথযাত্রা ১২৬ বছরে পড়তে চলেছে। ইতিমধ্যে ২৯শে জুন স্নানযাত্রা সম্পন্ন হওয়ার পর জগন্নাথদেব নবযৌবন রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছেন। আগামীকাল, ১৬ই জুলাই এবারের রথযাত্রা।

ঠাকুরবাড়ির অন্যান্য উৎসব

রথযাত্রা ছাড়াও সারা বছর এই বাড়িতে অন্যান্য বৈষ্ণব উৎসব পালন করা হয়, যেমন জন্মাষ্টমী, ঝুলন, চাঁচর, ফুলদোল, পঞ্চম দোল, রাসযাত্রা প্রভৃতি।

শেষের কথা

বিশ শতকের শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠিত কলকাতার এক সুবর্ণবণিক পরিবারের ঠাকুরবাড়ি এবং সেই বাড়িতে অধিষ্ঠিত দেববিগ্রহ ও রথ আজও তৎকালীন সময়ের স্থাপত্যশিল্প ও দারুশিল্পের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। শুরুর সময় থেকেই বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব, বিশেষ করে রথযাত্রা পালনের মধ্য দিয়ে সামাজিক মিলনের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে এই বাড়ি। অর্থাৎ, শৈল্পিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে শতবর্ষ পেরনো এই ঠাকুরবাড়ির গুরুত্ব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একসময় এ বাড়িতে জাঁকজমকভাবে রথযাত্রা পালন করা হত। এখন কিছুটা ম্লান হয়েছে বটে। তবে আজও সেই স্নানযাত্রার সময় থেকে শুরু করে উল্টোরথ পর্যন্ত নিষ্ঠাভরে এই উৎসব পালন করা হয়।

শৈল্পিক ও স্থাপত্যগত গুরুত্ব এবং ঐতিহাসিক মূল্যকে বিবেচনা করে পশ্চিমবঙ্গ হেরিটেজ কমিশন অনেক আগেই এই ঠাকুরবাড়িকে গ্রেড-ওয়ান হেরিটেজের সম্মান দিয়েছে। এরকম একটি মর্যাদাপূর্ণ সম্মানে সম্মানিত হওয়ার পরেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দিনের পর দিন ঠাকুরবাড়ির অবস্থার অবনতি ঘটছে। বাড়িটির সামনে ও পেছনের দিকে দেওয়ালের বিভিন্ন জায়গা ভেদ করে পরগাছা জন্মানোর ফলে ফাটল দেখা দিয়েছে। তার ফলে বর্ষাকালে বাড়ির ভেতরে জল পড়ে। দেওয়ালের অনেক অংশে পলেস্তারা খসে পড়েছে, রঙ চটে গেছে। সংরক্ষণের অভাবে দিনের পর দিন পঙ্খের ও জাফরির কাজগুলি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

Chunimoni dasi thakurbari
ঠাকুরবাড়ির বাইরের অবস্থা

ব্যক্তিগত সম্পত্তি হেরিটেজ হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার সাথে সাথে অনেক নিষেধাজ্ঞা লাগু হ​য়! রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণের দায়িত্ব এসে পড়ে মালিকের ওপর। কিন্তু তাদের পক্ষে সম্ভবপর না হলে, ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে সরকারের ভূমিকা কী, সেবিষয়ে হেরিটেজ কমিশন ও কলকাতা পৌরসভার নির্দেশিকায় স্পষ্ট করে কিছুই বলা নেই। কমিশনের তরফে সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের কথা বলা হলেও ব্যক্তিগত সম্পত্তির ক্ষেত্রে, মালিকপক্ষ অসমর্থ বা উদাসীন হলে সমাধান কী, সেবিষয়ে কিছু নির্দেশ দেওয়া হয় না। হেরিটেজ হিসেবে নথিভুক্ত পশ্চিমবঙ্গের অনেক ব্যক্তিগত সম্পত্তির ক্ষেত্রে দুঃখজনক হলেও এটি একটি সাধারণ সমস্যা।

এত বিশাল বাড়ি সংস্কার ও সংরক্ষণের জন্য নিঃসন্দেহে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। সবার পক্ষে তা খরচ করা সম্ভব নাও হতে পারে। আসলে ইতিহাস, শিল্প, ধর্ম সবকিছুর ধারক এই ঠাকুরবাড়ি। বাড়িটি আছে বলেই আমরা আজ থেকে একশো বছর আগের স্থাপত্য, শিল্পের শৈলী দেখতে পারি, তখনকার সময়কে কিছুটা হলেও অনুভব করতে পারি। এ বাড়ির ছাদের নিচেই বিভিন্ন পুজো-অর্চনা, লোকসমাগম হয়। তাই বাড়িটির অস্তিত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ! ঠাকুরবাড়িটি থাকলেই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এর ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে। তপনবাবু জানালেন,

Tapan Kumar Deyআমার পক্ষে সম্ভব নয়, এত বড় ঠাকুরবাড়ি রিপেয়ার করা। হেরিটেজ যখন হয়েছে এবং সরকারের কাছে আপনাদের তরফ দিয়ে আমি আবেদন করতে চাই, চুনিমণি দাসীর ঠাকুরবাড়ির সংস্কার সম্পর্কে ভাবনা-চিন্তা করে কিছু পদক্ষেপ নিলে আমরা উপকৃত হব। এটাই আমি আবেদন করতে চাইছি। হেরিটেজ আমাকে এখনও অবধি কিছুই জানায়নি এবং ওনারা এখনও অবধি কিছুই করেনি। এই ঠাকুরবাড়ির যে রথ জগন্নাথের আপনারা দেখছেন, এই জগন্নাথের এত বড় রথ আমার মনে হয় কলকাতা শহরে নেই! সুতরাং এইটা একটা দ্রষ্টব্য স্থান। সুতরাং এইটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে, পরবর্তী প্রজন্ম যাতে ভবিষ্যতে জানতে পারে, দেখতে পারে, তার জন্য ওনাদের এগিয়ে আসা নিশ্চয়ই জরুরি।

…যদি সংস্কার না করানো যায়, এই এত বড় একটা দ্রষ্টব্য স্থান, সেটা কিন্তু ধ্বংস হয়ে যাবে! পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের কিছু জানতেই পারবে না। সুতরাং এটা যখন হেরিটেজ হয়েছে, হেরিটেজের উচিত এটাকে রক্ষণাবেক্ষণ করা। আপনাদের তরফ দিয়ে আমার আবেদন, যদি ওনারা একটুখানি, হেরিটেজ যখন হয়েছে, [যদি] সংস্কার করতে পারেন, তাহলে একটা কলকাতার দ্রষ্টব্য স্থান হবে এটা। এটাই আবেদন আমার।

এইসব ঐতিহ্যের ঘরবাড়িগুলি বাঙালির সম্পদ। এদেরকে রক্ষা করা খুবই প্রয়োজন। যদিও কী উপায়ে তা করা সম্ভব, আমার অজানা। হেরিটেজ কমিশন বা কলকাতা পুরসভা আরও সক্রিয় হয়ে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন বাড়ির লোকেদের সাথে আলোচনা করে সমাধান খুঁজলে বা সরকারের তরফে বিবেচনা-সাপেক্ষে এই সম্পদগুলিকে রক্ষার স্বার্থে অনুদানের ব্যবস্থা করলে, হয়ত অদূর ভবিষ্যতে এই বাড়িগুলির সুদিন ফিরতে পারে। যদি কোনও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হেরিটেজ রক্ষার দায়িত্বে কাজ করে থাকে, তারাও উদ্যোগী হলে কাজ হতে পারে। গত বছর চুনিমণি দাসীর বাড়িতে উল্টোরথের দিন যাওয়া থেকে আজ অবধি, এই এক বছরে আমাদের রাজ্যের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়েছে। পূর্ববর্তী রাজ্য সরকারকে সরিয়ে নতুন দল সরকার গঠন করেছে। এই নতুন সরকার হেরিটেজ-সংক্রান্ত বিষয়ে কোনও নতুন পদক্ষেপ নেয় কি না সেটাই দেখার। তপনবাবুর সাথে আলোচনার সময়ে তাঁর কথার মধ্যে আক্ষেপ, হতাশা লক্ষ করেছিলাম। তা সত্ত্বেও কোথাও না কোথাও তিনি সুদিনের আশা করেন। আসলে আশা নিয়েই তো মানুষ বাঁচে! আমরাও আশা করতে পারি, সমস্ত জটিলতা কাটিয়ে চুনিমণি দাসীর ঠাকুরবাড়ি আবারও একদিন পুরনো ছন্দে ফিরবে। আরও বহু বছর এই বাড়িতে অন্যান্য উৎসবের সাথে রথযাত্রা ধুমধামের সাথে পালিত হবে।


* ন্যাড়া গির্জা ছিল সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারের কাছে। এখন আর তার কোনও অস্তিত্ব নেই। ন্যাড়া গির্জা সম্পর্কে আমাকে তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছেন বিশিষ্ঠ গবেষক, ইতিহাসবিদ ও লেখক গৌতম বসুমল্লিক।
** তারাপদ সাঁতরার “কলকাতার মন্দির-মসজিদ – স্থাপত্য-অলংকরণ-রূপান্তর” বইতে এই বাড়িটি পটলডাঙায় অবস্থিত বলে উল্লেখ আছে।

তথ্যঋণ:

গ্রন্থপঞ্জি

  • দত্ত প্রাণকৃষ্ণ, কলিকাতার ইতিবৃত্ত, পুস্তক বিপণি, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ, আগস্ট, ১৯৮১
  • পত্রী পূর্ণেন্দু, পুরনো কলকাতার কথাচিত্র, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, সপ্তম সংস্করণ, আগস্ট, ২০১৭
  • মিত্র সুধীর কুমার, হুগলী জেলার ইতিহাস ও বঙ্গসমাজ, দ্বিতীয় খন্ড, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, প্রথম দে’জ সংস্করণ, এপ্রিল, ২০১৩
  • মুখোপাধ্যায় সোমা, বাংলার জগন্নাথ, তবুও প্রয়াস, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ, রথযাত্রা ১৪২৯
  • মুখোপাধ্যায় সোমা, ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে কলকাতার জগন্নাথ, অনুভূতি প্রকাশন, পশ্চিম মেদিনীপুর, প্রথম প্রকাশ, রথযাত্রা ১৪৩২ (জুন, ২০২৫)
  • ভূতি কুঞ্জলাল, সুবর্ণ বণিক্, সান্যাল এন্ড কোম্পানি, কলিকাতা ১৩০৯
  • লাহা শ্রীনরেন্দ্রনাথ, সুবর্ণবণিক্ কথা ও কীর্তি, প্রথম খন্ড, হৃষীকেশ সিরিজ, কলিকাতা ১৯৪০
  • লাহা শ্রীনরেন্দ্রনাথ, সুবর্ণবণিক্ কথা ও কীর্তি, দ্বিতীয় খন্ড, হৃষীকেশ সিরিজ, কলিকাতা ১৯৪১
  • রায়চৌধুরী পার্ব্বতীশঙ্কর, আদিশূর ও বল্লালসেন – অম্বষ্ঠজাতীয় নৃপতিদিগের ঐতিহাসিক বিবরণ, বৈদেশিক, কলকাতা, ১২৮৪
  • মজুমদার শ্রীরমেশচন্দ্র, বাংলা দেশের ইতিহাস, প্রথম খন্ড প্রাচীন যুগ, জেনারেল প্রিন্টার্স য়্যান্ড পাব্লিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলিকাতা, চতুর্থ সংস্করণ, ১৩৭৩
  • চন্দ রমাপ্রসাদ, গৌড়রাজমালা, নবভারত পাবলিশার্স, কলিকাতা, প্রথম নবভারত সংস্করণ, মার্চ ১৯৭৫
  • বন্দ্যোপাধ্যায় শ্রীরাখালদাস, বাঙ্গালার ইতিহাস, প্রথম খন্ড, মনোমোহন প্রকাশনী, কলিকাতা, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৯৬০
  • বসু শ্রীনগেন্দ্রনাথ, বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস (রাজন্যকাণ্ড) কায়স্থ কান্ডের প্রথমাংশ, Visvakosha Press, Calcutta, ১৩২১
  • রায় নীহাররঞ্জন, বাঙ্গালীর ইতিহাস আদিপর্ব, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, অষ্টম সংস্করণ, বৈশাখ ১৪২০
  • Paul Promode Lal, The Early History of Bengal (From the Earliest Times to the Muslim Conquest) Vol 1, The Indian Research Institute, Calcutta, 1939
  • ড: সরকার দীনেশচন্দ্র, পাল-সেন যুগের বংশানুচরিত, সাহিত্যলোক, কলিকাতা
  • ঘোষ বিনয়, পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি, পুস্তক প্রকাশক, কলিকাতা, প্রথম প্রকাশ, জানুয়ারী ১৯৫০
  • মিত্র পল্লব সংকলিত ও সম্পাদিত, অঞ্চলচর্চা ও আঞ্চলিক ইতিহাস প্রসঙ্গ সুধীরকুমার মিত্র শতবর্ষ শ্রদ্ধার্ঘ্য গ্রন্থ, পারুল, কলকাতা, প্রথম সংস্করণ, ২০১৯
  • শেঠ নগেন্দ্রনাথ সংকলিত, কলিকাতাস্থ তন্তু-বণিক জাতির ইতিহাস, কলিকাতা, প্রথম সংস্করণ, ১৯৫০

কথোপকথন

পত্রপত্রিকা

  • মুখোপাধ্যায় সোমা, “সুবর্ণ দিশায় উদ্ধারণ দত্ত”, সুবর্ণ রেখা, কলকাতা, পঞ্চম সংখ্যা ২০২২

সংবাদপত্র

  • যুগান্তর – ১৪ই জুলাই ১৯৫৩
  • যুগান্তর – ২২শে জুন ১৯৫৫
  • যুগান্তর – ২৪শে জুন ১৯৬৩
  • যুগান্তর – ২১শে জুন ১৯৬৬
  • যুগান্তর – ৩০শে জুন ১৯৭৬
  • যুগান্তর – ২৭শে জুন ১৯৭৯
  • যুগান্তর – ১৪ই জুলাই ১৯৮০
  • আনন্দবাজার – ২৪শে জুন ১৯৭১
ভ্রমণের তারিখ: ২৯শে জুন (১৪ই আষাঢ় ১৪৩২) ও ৫ই জুলাই ২০২৫ (২০শে আষাঢ় ১৪৩২)
ক্যামেরা: GoPro Hero 12, Nikon D3300 (Lens: 18-105), Motorola Edge 50 Fusion
ছবি সৌজন্য: [১, ২, ৩, ৪, ৬] যুগান্তর, [৬] আনন্দবাজার, [৭] A. Upjohn, [১১, ১২] স্বর্নাভ বৈদ্য ও [৮, ৯, ১০, ১৩] রাজ কুমার দে
বিশেষ কৃতজ্ঞতা: তপন কুমার দে, রাজ কুমার দেগৌতম বসুমল্লিক

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!