যশোর রোড (যশোহর রোড) একটি আন্তর্জাতিক রাস্তা, যা ভারতকে বাংলাদেশের সাথে সড়কপথে যুক্ত করেছে। কলকাতা থেকে বাংলাদেশের যশোর পর্যন্ত বিস্তৃত এই দীর্ঘ রাস্তা দু’দেশের যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ভারতে দমদম থেকে বারাসাত পর্যন্ত এই রাস্তা ১২ নম্বর জাতীয় সড়কের (NH 12) অংশ। এবং বারাসাত থেকে বনগাঁর পেট্রাপোল সীমান্ত পর্যন্ত অংশটি হল ১১২ নম্বর জাতীয় সড়ক (NH 112), যা অতীতে ৩৫ নম্বর জাতীয় সড়ক (NH 35) নামে পরিচিত ছিল। উনিশ শতকে নির্মিত এই রাস্তা ব্রিটিশ শাসন, স্বাধীনতা, দেশভাগ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদি বহু ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় বহু মানুষ ওদেশ থেকে এই পথে ভারতে আসতে বাধ্য হয়। সেইসময় যশোর রোডের দু’ধারে বসেছিল শরণার্থী শিবির! সহায়-সম্বলহীন মানুষগুলোর দুঃখ-দুর্দশা ও দৈনন্দিন সংগ্রামকে প্রত্যক্ষ করে, মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ রচনা করেছিলেন তাঁর বিখ্যাত প্রতিবাদী কবিতা ‘September on Jessore Road’। পরবর্তিতে সেই কবিতা অবলম্বনেই মৌসুমী ভৌমিক বেঁধেছিলেন তাঁর বিখ্যাত গান – ‘যশোর রোড’।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব ছাড়াও, যশোর রোডকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে রাস্তার দু’ধারে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েক হাজার বিশাল সব গাছের সারি। এই গাছগুলি মূলত শিরীষ বা ‘রেইন ট্রি’। ছেলেবেলায় বনগাঁতে থাকাকালীন, শতাব্দী প্রাচীন গাছগুলিই আমাকে বেশি আকৃষ্ট করত, তাদের বিশালত্ব বিস্ময় জাগাত! ওদের ডালপালা ও ঘন সবুজ পাতায় তৈরি ক্যানোপির মাঝ বরাবর চলে যাওয়া যশোর রোডের দৃশ্য ছিল চোখের আরাম। বছরের পর বছর সারিবদ্ধ গাছগুলি এই রাস্তার ওপর দিয়ে চলা পথিকদের নিঃশর্তে ছায়া দিয়ে গেছে। গরমে হয়ে উঠেছে পথচারীদের ওয়েসিস!
২০১৫ সাল থেকে যশোর রোড সম্প্রসারণের প্রয়োজন জোড়ালো হতে থাকে। তৎকালীন রাজ্য সরকারের তরফে উন্নয়নের স্বার্থে রাস্তার দু’ধারের গাছগুলি কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়! এই সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে অনেক যুক্তি ছিল, আছে, থাকবেও। তবে এত বিপুল সংখ্যক গাছ নিধনের ফলে পরিবেশের যে অপূরণীয় ক্ষতি হবে – সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। এই অঞ্চলগুলির প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হবে। ফলে পরবর্তীতে গাছ কাটা শুরু হলে, সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের পক্ষ থেকে বিরোধীতা করা হয়, পরিবেশবিদ ও স্থানীয়দের একাংশ আন্দোলনের পথ বেছে নেয়। গড়ে ওঠে ‘যশোর রোড গাছ বাঁচাও কমিটি’। পরিবেশের স্বার্থে গাছগুলিকে বাঁচিয়ে রাস্তা সম্প্রসারণের উপায় নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব ও সম্ভাবনা থাকলেও, নানারকম জটিলতায় সে-সব কখনও সম্ভব হয়নি। প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে অস্তিত্বের লড়াইয়ে এখনও অনেক গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকলেও, এত বিরোধিতা এবং আন্দোলনের পরেও তাদের ভবিষ্যৎ নিঃসন্দেহে অনিশ্চিত।
যশোর রোডের গাছগুলি ভবিষ্যতে কখনও কাটা হলে পরিবেশের ক্ষতি যেমন হবে, পাশাপাশি দীর্ঘ সময়ের সাথীদের হারিয়ে এই রাস্তা নিশ্চিতভাবে তার স্বকীয়তা হারাবে! রাস্তার দু’ধারে গাছগুলি সারি বেধে দাঁড়িয়ে থাকার ফলে সৃষ্ট বৃক্ষবীথির অপূর্ব সৌন্দর্য থেকে পরবর্তী প্রজন্ম বঞ্চিত হবে। তাই ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে, বর্তমান রাস্তার একটি ডকুমেন্টেশন করার তাগিদে ছোটোবেলার বন্ধু ডালটন ও পল্টুর সাথে বেরিয়ে পরেছিলাম। বনগাঁ ১নং রেল গেট থেকে শুরু করে চাঁদপাড়া বাজার হয়ে, একই পথে ফিরে এসেছিলাম। দীর্ঘ পথের ছোট একটি অংশ ধরা থাকল আমার ক্যামেরায়!
যাত্রাপথ: ⇋ বনগাঁ ১নং রেল গেট, বক্সীপল্লি, সিকদারপল্লি, সুভাষপল্লি, কালুপুর, কালুপুর বাজার, দোগাছিয়া, দোগাছিয়া বাজার, মণ্ডলপাড়া, মণ্ডলপাড়া বাজার, চাঁদপাড়া, চাঁদপাড়া বাজার
দল: পল্টু দত্ত, ডালটন সরকার ও রাজা সাহা
ক্যামেরা: GoPro Hero 11
বিশেষ কৃতজ্ঞতা: ডালটন সরকার
